শীতকালীন রুক্ষতার প্রসঙ্গে গ্লিসারিনের নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব! রুক্ষ ত্বক থেকে ফাটা গোড়ালি—সব সমস্যার অব্যর্থ সমাধান, যা প্রায় কয়েক দশক ধরে রূপচর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্লিসারিন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
![]() |
| BD Beauty tips-রূপচর্চায় গ্লিসারিন |
শীতকালের সঙ্গে গ্লিসারিনের চিরন্তন সম্পর্কের কথা প্রায় সব বাঙালিই জানেন। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। সারাবছর বাড়িতে গ্লিসারিনের দেখা না মিললেও, শীতকালে মাসকাবারি জিনিসের সঙ্গেই বাড়িতে আসত গ্লিসারিন। প্রতিদিন রাতে মুখে, হাতে-পায়ে চলত গ্লিসারিনের মালিশ। টিভিতেও সেই একই চিত্র! সাধারণ সাবান নয়, টিভির পর্দা জুড়ে শীতের কয়েক মাস শুধুই গ্লিসারিন সাবানের বিজ্ঞাপন। অবশ্য এই পরিমাণ প্রাধান্য দেওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। শীতকালীন রুক্ষতার অত্যাচারে ত্বক আর চুলও জবাব দিয়ে দিত। আর সেই অবস্থার উন্নতি ঘটাতেই ডাক পড়ত গ্লিসারিনের। গ্লিসারিনের ছোঁয়া পেতেই সব শুষ্কতা নিমেষে গায়েব! ফলে বছরের এই কয়েক মাস গ্লিসারিনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। এত বছর পরেও এই ঘটনায় কিন্তু কোনও পরিবর্তন হয়নি। আজও গ্লিসারিন রূপচর্চায় ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ক্রিম, লোশনও তার জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাগ বসাতে পারেনি। আর তাই তো গ্লিসারিন নিয়েই এবারের বিশেষ প্রতিবেদন। কয়েকদিন গ্লিসারিন ব্যবহার করেই দেখুন, শীতের স্বভাবসুলভ রুক্ষতাকে বশ মানাতে পারেন কি না!
গ্লিসারিনের উপকারিতা
ত্বকের ময়শ্চার লেভেল বজায় রাখতে গ্লিসারিনের জুড়ি মেলা ভার। সেই কারণেই ময়শ্চারাইজ়ার হিসেবেই এ ব্যবহার সবথেকে বেশি। বাতাসের জলীয় বাষ্প শোষণ করার ক্ষমতা রয়েছে গ্লিসারিনের। ত্বকের শুষ্কতাও যে কমে আসবে, ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গেই তা বুঝতে পারবেন।
ত্বকের বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই তা নির্জীব দেখাতে শুরু করে। পাশাপাশি ত্বকের ইরিটেশন, লালচেভাব এবং অন্যান্য নানা সমস্যাও বাড়তে থাকে। ত্বকের ময়শ্চার লেভেল ধরে রাখার ক্ষমতা এর মধ্যে অন্যতম। সঠিক আর্দ্রতার অভাবে ত্বকের রুক্ষতাও আরও বাড়তে থাকে। নিয়মিত গ্লিসারিন ব্যবহার করলে অবশ্য এই সব সমস্যাকেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন। রুক্ষতাকে দূরে সরিয়ে ত্বক হয়ে উঠবে মসৃণ এবং কোমল।
ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতেও গ্লিসারিন দারুণ কার্যকরী। এটি ত্বকের উপরে পাতলা পরত তৈরি করে। ফলে পরিবেশের বিভিন্ন দূষণ থেকেও ত্বক সুরক্ষিত থাকে। তাছাড়া ত্বকের আর্দ্রতা শীতের রুক্ষ আবহাওয়ায় নষ্ট হয়ে যায় না।
প্রতিদিন গ্লিসারিন ব্যবহার করলে ত্বক নরম এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বলও থাকে। ত্বকের একেবারে গভীরে প্রবেশ করে কোষে কোষে পুষ্টি পৌঁছে দেয় বলে সেল রিপেয়ারিংও দ্রুততর হয়। ফলে বিভিন্ন দাগছোপও দ্রুত হালকা হয়ে আসে।
ত্বকের বিভিন্ন রোগ যেমন সোরিয়াসিস, একজ়িমা, রোজ়েসিয়া ইত্যাদি কমাতেও গ্লিসারিন খুব ভাল।
ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন
গ্লিসারিনের উপকার তো জানলেন। এবার রূপচর্চায় একে ব্যবহার করার পালা। টোনার থেকে ময়শ্চারাইজ়ার, সবেতেই মিশিয়ে নিতে পারেন গ্লিসারিন। বছরের বাকি সময় না হলেও, অন্তত শীতের এই কয়েক মাস গ্লিসারিন ব্যবহার করে দেখুন। ত্বক এবং চুলের সমস্যা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না।
টোনার: একের চার কাপ গ্লিসারিন এবং দেড়কাপ গোলাপজল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ স্প্রে বোতলে ভরে রেখে দিন। প্রতিদিন টোনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
ক্লেনজ়ার: ৩ চা-চামচ দুধ এবং ১ চা-চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে পুরো মুখে এই মিশ্রণ মাসাজ করুন। সারারাত রেখে পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন। যাঁদের কম্বিনেশন স্কিন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই মিশ্রণ খুবই উপকারী।
ময়শ্চারাইজ়ার: একটি বাটিতে ২০০-২৫০ মিলি গ্লিসারিন নিন। এতে ২ টেবলচামচ টাটকা পাতিলেবুর রস মিশিয়ে বোতলে ভরে রেখে দিন। প্রতিদিন রাতে এই মিশ্রণ মুখে, হাতে-পায়ে লাগান। বিছানায় যাওয়ার আগে যেন ত্বক এই মিশ্রণ পুরোপুরি শুষে নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। কিছুদিন ব্যবহার করলেই দেখবেন ত্বক অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং নরম হয়ে উঠেছে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে পাকা কলা এবং গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারেন। ১০-১৫ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকে ইন্সট্যান্ট জেল্লা আসবে।
অ্যাকনের প্রতিকারে: ১ টেবলচামচ গ্লিসারিন, আধ টেবলচামচ বোরিক পাউডার, ১ চা-চামচ কর্পূর এবং এককাপ ডিসটিলড ওয়াটার একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। অ্যাকনের উপর এই মিশ্রণ তুলোয় করে লাগাতে পারেন। তবে ত্বক সেনসিটিভ হলে এই মিশ্রণ ব্যবহার না করাই ভাল। আগে হাতে প্যাচ টেস্ট করে দেখে নিতে পারেন, এর থেকে ত্বকে কোনওরকম অ্যালার্জি হচ্ছে কি না। ৫-১০ মিনিট পর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এই মিশ্রণ ত্বকের পোরস পরিষ্কার করতেও কার্যকরী। এরপর সঙ্গে সঙ্গে মুখে কয়েকবার ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিন। এতে পোরসের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ত্বকের ভিতরে ময়লা জমতে পারবে না।
অ্যান্টি-এজিং ট্রিটমেন্ট: একটি পাত্রে একটা ডিম ফেটিয়ে নিন। এতে ১ চা-চামচ মধু এবং ১ চা-চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। ভালভাবে মিশিয়ে মুখে লাগান। ২০ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের দৃঢ়তা বাড়বে। ফলে বলিরেখা, ফাইন লাইনস ইত্যাদি বয়সজনিত সমস্যাও কমবে।
শুষ্ক ত্বকের জন্য: শীতকালে সবথেকে বেশি সমস্যা শুষ্ক ত্বকেই দেখা যায়। ত্বকের ধরন যেমনই হোক না কেন, শীতকালে এমনিতেই তা শুষ্ক হয়ে পড়ে। আর যাঁদের ত্বক সারাবছরই শুষ্ক থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে তো সমস্যার পোয়া বারো! তাঁদের জন্য গ্লিসারিন কিন্তু মোক্ষম দাওয়াই। শীতের রুক্ষ, শুষ্ক আবহাওয়ার অত্যাচার থেকে ত্বককে বাঁচাতে গ্লিসারিনের কোনও বিকল্প নেই। প্রতিদিন সকালে কোনও ক্রিমবেসড বা জেন্টল ফেসওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করার পর, ত্বক ভিজে থাকা অবস্থাতেই তুলোয় করে অল্প গ্লিসারিন মুখে লাগাতে পারেন। এছাড়া সপ্তাহে দু’বার একটি ময়শ্চারাইজ়িং ফেসমাস্ক ব্যবহার করুন। ৩ চা-চামচ কেওলিন ক্লে, ১ চা-চামচ বেনটোনাইট ক্লে (পরিবর্তে মুলতানি মাটিও ব্যবহার করতে পারেন), ১ চা-চামচ গ্লিসারিন, ২ ফোঁটা রোজ় এসেনশিয়াল অয়েল এবং পরিমাণমতো জল মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করে নিন। পুরো মুখে লাগিয়ে শুকিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করুন। এরপর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। জলের পরিবর্তে গ্লিসারিন দিয়ে বানানো ঘরোয়া ক্লেনজ়ারও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া আরও একটি প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। আধকাপ জল, ১ চা-চামচ কর্নফ্লাওয়ার এবং ১১/২ টেবলচামচ গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে ফুটতে দিন। মিশ্রণ স্বচ্ছ হয়ে এলে আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন। ভিজে ত্বকে সামান্য এই মিশ্রণ লাগিয়ে ভালভাবে মাসাজ করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ফাটা ঠোঁটের যত্ন: রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঠোঁটে গ্লিসারিনও লাগাতে পারেন। কিংবা শুকনো গোলাপের পাপড়ি গুঁড়ো করে গ্লিসারিনের সঙ্গে মিশিয়ে স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁট মসৃণ এবং কোমল হবে।
ফাটা গোড়ালির জন্য: শীতকালে পা ফাটার সমস্যা অত্যন্ত কমন। এক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারেন গ্লিসারিন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে পা ভালভাবে পরিষ্কার করে নিন। এরপর তুলোয় করে খানিকটা গোলাপজল নিয়ে পা ভালভাবে মুছে পেট্রোলিয়াম জেলি এবং গ্লিসারিন মিশিয়ে লাগান। পুরু করে এই মিশ্রণ লাগানোর পর মোজা পরে শুতে যান। সপ্তাহে একবার মুলতানি মাটি, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল এবং হলুদগুঁড়ো মিশিয়ে ফাটা গোড়ালিতে লাগাতে পারেন। শুকিয়ে গেলে ঘষে ধুয়ে নিন।
চুলের যত্ন
ত্বকের জন্য গ্লিসারিন যতটা উপকারী, চুলের জন্যও গ্লিসারিন ঠিক ততটাই উপকারী। চুলের জট ছাড়াতে সাধারণত বাজারে যে সব ডিট্যাঙ্গলিং লিক্যুইড পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশিরভাগেই মুখ্য উপাদান হিসেবে থাকে এই গ্লিসারিন। সুতরাং চুল নরম রাখতে এই উপাদান যে কতটা কার্যকরী, তা আশা করি বুঝতেই পারছেন। তবে এছাড়াও চুলের বিভিন্ন সমস্যায় সমাধান হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন।
ডিপ কন্ডিশনার: শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় চুলের হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে গ্লিসারিন। শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনারের পরিবর্তে গ্লিসারিন চুলে লাগাতে পারেন। খানিকক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেলুন। চুল শুকিয়ে গেলেই বুঝতে পারবেন তা কতটা নরম হয়ে উঠেছে। লিভ-ইন কন্ডিশনার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন।
ময়শ্চারাইজ়িং হেয়ার স্প্রে: সম পরিমাণে জল এবং গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে বোতলে ভরে রাখতে পারেন। চুল অতিরিক্ত রুক্ষ বা শুষ্ক মনে হলে এই মিশ্রণ চুলে স্প্রে করলে উপকার পাবেন।
স্প্লিট এন্ডসের সমস্যায়: মূলত শুষ্কতার কারণেই চুলের ডগা চেরার সমস্যা হয়। বলাই বাহুল্য, শীতকালে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন। অল্প গ্লিসারিন ভিজে চুলের ডগাতে লাগাতে পারেন। এতে চুল শুকিয়ে গেলেও চুলের ময়শ্চার লেভেল বজায় থাকবে।
স্ক্যাল্পের ইচিং: এর প্রধান কারণও শুষ্কতা। অতিরিক্ত শুষ্কতার কারণে আবার দেখা দেয় খুশকি। দুই সমস্যাকেই বাগে আনতে অস্ত্র করুন গ্লিসারিনকে। অল্প পরিমাণে গ্লিসারিন হাতে নিয়ে হালকা হাতে স্ক্যাল্পে মাসাজ করুন। তবে জোরে ঘষবেন না। গ্লিসারিন চুলের গোড়া নরম করে দেয়। ফলে চুল পড়া বাড়তে পারে।
ত্বকের ময়শ্চার লেভেল বজায় রাখতে গ্লিসারিনের জুড়ি মেলা ভার। সেই কারণেই ময়শ্চারাইজ়ার হিসেবেই এ ব্যবহার সবথেকে বেশি। বাতাসের জলীয় বাষ্প শোষণ করার ক্ষমতা রয়েছে গ্লিসারিনের। ত্বকের শুষ্কতাও যে কমে আসবে, ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গেই তা বুঝতে পারবেন।
ত্বকের বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই তা নির্জীব দেখাতে শুরু করে। পাশাপাশি ত্বকের ইরিটেশন, লালচেভাব এবং অন্যান্য নানা সমস্যাও বাড়তে থাকে। ত্বকের ময়শ্চার লেভেল ধরে রাখার ক্ষমতা এর মধ্যে অন্যতম। সঠিক আর্দ্রতার অভাবে ত্বকের রুক্ষতাও আরও বাড়তে থাকে। নিয়মিত গ্লিসারিন ব্যবহার করলে অবশ্য এই সব সমস্যাকেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন। রুক্ষতাকে দূরে সরিয়ে ত্বক হয়ে উঠবে মসৃণ এবং কোমল।
ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতেও গ্লিসারিন দারুণ কার্যকরী। এটি ত্বকের উপরে পাতলা পরত তৈরি করে। ফলে পরিবেশের বিভিন্ন দূষণ থেকেও ত্বক সুরক্ষিত থাকে। তাছাড়া ত্বকের আর্দ্রতা শীতের রুক্ষ আবহাওয়ায় নষ্ট হয়ে যায় না।
প্রতিদিন গ্লিসারিন ব্যবহার করলে ত্বক নরম এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বলও থাকে। ত্বকের একেবারে গভীরে প্রবেশ করে কোষে কোষে পুষ্টি পৌঁছে দেয় বলে সেল রিপেয়ারিংও দ্রুততর হয়। ফলে বিভিন্ন দাগছোপও দ্রুত হালকা হয়ে আসে।
ত্বকের বিভিন্ন রোগ যেমন সোরিয়াসিস, একজ়িমা, রোজ়েসিয়া ইত্যাদি কমাতেও গ্লিসারিন খুব ভাল।ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন
![]() |
| BD Beauty tips- ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন কিভাবে মুখে ব্যবহার করা হয়। |
গ্লিসারিনের উপকার তো জানলেন। এবার রূপচর্চায় একে ব্যবহার করার পালা। টোনার থেকে ময়শ্চারাইজ়ার, সবেতেই মিশিয়ে নিতে পারেন গ্লিসারিন। বছরের বাকি সময় না হলেও, অন্তত শীতের এই কয়েক মাস গ্লিসারিন ব্যবহার করে দেখুন। ত্বক এবং চুলের সমস্যা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না।
টোনার: একের চার কাপ গ্লিসারিন এবং দেড়কাপ গোলাপজল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ স্প্রে বোতলে ভরে রেখে দিন। প্রতিদিন টোনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
ক্লেনজ়ার: ৩ চা-চামচ দুধ এবং ১ চা-চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে পুরো মুখে এই মিশ্রণ মাসাজ করুন। সারারাত রেখে পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন। যাঁদের কম্বিনেশন স্কিন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই মিশ্রণ খুবই উপকারী।
ময়শ্চারাইজ়ার: একটি বাটিতে ২০০-২৫০ মিলি গ্লিসারিন নিন। এতে ২ টেবলচামচ টাটকা পাতিলেবুর রস মিশিয়ে বোতলে ভরে রেখে দিন। প্রতিদিন রাতে এই মিশ্রণ মুখে, হাতে-পায়ে লাগান। বিছানায় যাওয়ার আগে যেন ত্বক এই মিশ্রণ পুরোপুরি শুষে নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। কিছুদিন ব্যবহার করলেই দেখবেন ত্বক অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং নরম হয়ে উঠেছে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে পাকা কলা এবং গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারেন। ১০-১৫ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকে ইন্সট্যান্ট জেল্লা আসবে।
অ্যাকনের প্রতিকারে: ১ টেবলচামচ গ্লিসারিন, আধ টেবলচামচ বোরিক পাউডার, ১ চা-চামচ কর্পূর এবং এককাপ ডিসটিলড ওয়াটার একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। অ্যাকনের উপর এই মিশ্রণ তুলোয় করে লাগাতে পারেন। তবে ত্বক সেনসিটিভ হলে এই মিশ্রণ ব্যবহার না করাই ভাল। আগে হাতে প্যাচ টেস্ট করে দেখে নিতে পারেন, এর থেকে ত্বকে কোনওরকম অ্যালার্জি হচ্ছে কি না। ৫-১০ মিনিট পর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এই মিশ্রণ ত্বকের পোরস পরিষ্কার করতেও কার্যকরী। এরপর সঙ্গে সঙ্গে মুখে কয়েকবার ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিন। এতে পোরসের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ত্বকের ভিতরে ময়লা জমতে পারবে না।
অ্যান্টি-এজিং ট্রিটমেন্ট: একটি পাত্রে একটা ডিম ফেটিয়ে নিন। এতে ১ চা-চামচ মধু এবং ১ চা-চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। ভালভাবে মিশিয়ে মুখে লাগান। ২০ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের দৃঢ়তা বাড়বে। ফলে বলিরেখা, ফাইন লাইনস ইত্যাদি বয়সজনিত সমস্যাও কমবে।
শুষ্ক ত্বকের জন্য: শীতকালে সবথেকে বেশি সমস্যা শুষ্ক ত্বকেই দেখা যায়। ত্বকের ধরন যেমনই হোক না কেন, শীতকালে এমনিতেই তা শুষ্ক হয়ে পড়ে। আর যাঁদের ত্বক সারাবছরই শুষ্ক থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে তো সমস্যার পোয়া বারো! তাঁদের জন্য গ্লিসারিন কিন্তু মোক্ষম দাওয়াই। শীতের রুক্ষ, শুষ্ক আবহাওয়ার অত্যাচার থেকে ত্বককে বাঁচাতে গ্লিসারিনের কোনও বিকল্প নেই। প্রতিদিন সকালে কোনও ক্রিমবেসড বা জেন্টল ফেসওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করার পর, ত্বক ভিজে থাকা অবস্থাতেই তুলোয় করে অল্প গ্লিসারিন মুখে লাগাতে পারেন। এছাড়া সপ্তাহে দু’বার একটি ময়শ্চারাইজ়িং ফেসমাস্ক ব্যবহার করুন। ৩ চা-চামচ কেওলিন ক্লে, ১ চা-চামচ বেনটোনাইট ক্লে (পরিবর্তে মুলতানি মাটিও ব্যবহার করতে পারেন), ১ চা-চামচ গ্লিসারিন, ২ ফোঁটা রোজ় এসেনশিয়াল অয়েল এবং পরিমাণমতো জল মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করে নিন। পুরো মুখে লাগিয়ে শুকিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করুন। এরপর ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। জলের পরিবর্তে গ্লিসারিন দিয়ে বানানো ঘরোয়া ক্লেনজ়ারও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া আরও একটি প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। আধকাপ জল, ১ চা-চামচ কর্নফ্লাওয়ার এবং ১১/২ টেবলচামচ গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে ফুটতে দিন। মিশ্রণ স্বচ্ছ হয়ে এলে আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন। ভিজে ত্বকে সামান্য এই মিশ্রণ লাগিয়ে ভালভাবে মাসাজ করে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ফাটা ঠোঁটের যত্ন: রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঠোঁটে গ্লিসারিনও লাগাতে পারেন। কিংবা শুকনো গোলাপের পাপড়ি গুঁড়ো করে গ্লিসারিনের সঙ্গে মিশিয়ে স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁট মসৃণ এবং কোমল হবে।
ফাটা গোড়ালির জন্য: শীতকালে পা ফাটার সমস্যা অত্যন্ত কমন। এক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারেন গ্লিসারিন। রাতে শুতে যাওয়ার আগে পা ভালভাবে পরিষ্কার করে নিন। এরপর তুলোয় করে খানিকটা গোলাপজল নিয়ে পা ভালভাবে মুছে পেট্রোলিয়াম জেলি এবং গ্লিসারিন মিশিয়ে লাগান। পুরু করে এই মিশ্রণ লাগানোর পর মোজা পরে শুতে যান। সপ্তাহে একবার মুলতানি মাটি, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল এবং হলুদগুঁড়ো মিশিয়ে ফাটা গোড়ালিতে লাগাতে পারেন। শুকিয়ে গেলে ঘষে ধুয়ে নিন।চুলের যত্ন
ত্বকের জন্য গ্লিসারিন যতটা উপকারী, চুলের জন্যও গ্লিসারিন ঠিক ততটাই উপকারী। চুলের জট ছাড়াতে সাধারণত বাজারে যে সব ডিট্যাঙ্গলিং লিক্যুইড পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশিরভাগেই মুখ্য উপাদান হিসেবে থাকে এই গ্লিসারিন। সুতরাং চুল নরম রাখতে এই উপাদান যে কতটা কার্যকরী, তা আশা করি বুঝতেই পারছেন। তবে এছাড়াও চুলের বিভিন্ন সমস্যায় সমাধান হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন।
ডিপ কন্ডিশনার: শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় চুলের হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে গ্লিসারিন। শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনারের পরিবর্তে গ্লিসারিন চুলে লাগাতে পারেন। খানিকক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেলুন। চুল শুকিয়ে গেলেই বুঝতে পারবেন তা কতটা নরম হয়ে উঠেছে। লিভ-ইন কন্ডিশনার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন।
ময়শ্চারাইজ়িং হেয়ার স্প্রে: সম পরিমাণে জল এবং গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে বোতলে ভরে রাখতে পারেন। চুল অতিরিক্ত রুক্ষ বা শুষ্ক মনে হলে এই মিশ্রণ চুলে স্প্রে করলে উপকার পাবেন।
স্প্লিট এন্ডসের সমস্যায়: মূলত শুষ্কতার কারণেই চুলের ডগা চেরার সমস্যা হয়। বলাই বাহুল্য, শীতকালে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবহার করতে পারেন গ্লিসারিন। অল্প গ্লিসারিন ভিজে চুলের ডগাতে লাগাতে পারেন। এতে চুল শুকিয়ে গেলেও চুলের ময়শ্চার লেভেল বজায় থাকবে।
স্ক্যাল্পের ইচিং: এর প্রধান কারণও শুষ্কতা। অতিরিক্ত শুষ্কতার কারণে আবার দেখা দেয় খুশকি। দুই সমস্যাকেই বাগে আনতে অস্ত্র করুন গ্লিসারিনকে। অল্প পরিমাণে গ্লিসারিন হাতে নিয়ে হালকা হাতে স্ক্যাল্পে মাসাজ করুন। তবে জোরে ঘষবেন না। গ্লিসারিন চুলের গোড়া নরম করে দেয়। ফলে চুল পড়া বাড়তে পারে।



0 মন্তব্যসমূহ